তখন বছরে প্রায় ছয়টি মাস বৃষ্টি বাদল
লেগেই থাকতো।
মফস্বল শরেরর বুকজুড়ে বৃষ্টি, অদ্ভুত তার প্রকৃতি।
গাছের পাতা হতে গড়িয়ে পড়া নান্দনিক বৃষ্টি, অদ্ভুত তার প্রকৃতি।
টিনের চালায় ঝুমুরঝুমুর তালের বৃষ্টি,
স্কুলের বই, নিউজপ্রিন্টের খাতা,
খাঁকি প্যান্ট, সাদা জামা ভেজানো বৃষ্টি
অদ্ভুত সে প্রকৃতি।
মাঠের ঘন ঘাসের ডগা অবধি ডোবানো বৃষ্টি,
তাতে পা ডোবানো বৃষ্টি, অদ্ভুত তার প্রকৃতি।
বৃষ্টির হলকম্পে একটু ঠাণ্ডা লাগতেই
পুকুরে ডুব দিয়ে গরম জলের উচ্ছ্বাস,
অদ্ভুত সে প্রকৃতি।
প্রবল সে বৃষ্টির ঘর্ষণজনিত কারণে
বেরিয়ে পড়তো ইট বিছানো পথের হাড়গোড়।
সেসব বৃষ্টির রাতে আর ঘুম আসতো কই?
সারারাত জেগে ভোরের আলোর প্রতীক্ষা।
রাত পেরুতেই, সাইকেলের প্যাডেল মেরে
পৌঁছে যাওয়া বন্ধুদের বাসায়, পা টিপেটিপে নীচুস্বরে ঘুম ভাঙানো,
বলছি, মনোজ আমার প্রিয় বন্ধুটির কথা।
লেখাপড়ায় কিছুটা দূর্বল হলেও, ফুটবলে তার ভীষণ ঝোঁক।
জাদু ছিলো ওর পায়ে।
একবার কোনমতে ঠেলে ঠুলে তার পা পর্যন্ত
বল পৌঁছে দিতে পারলেই কেল্লাফতে।
ও'বলের একটাই আস্তানা, অপজিশনের গোল পোস্টের জাল।
মিকাশা ছিলো তার প্রিয় বল।
বলের জন্য চোদ্দ মুল্লুক দূর হেটে গিয়েও
এক্লাব ওক্লাব থেকে বল চেয়ে নিয়ে ফিরত।
আকাশে মেঘেরডাক দিলেই তার প্রাণ নেচে উঠত।
ফুটবল ছিলো তার জীবন।
আমাদের যখন সেলফ ভর্তি থাকত গাদা গাদা
বই আর নোট পত্রে,
তার ঘরময় এদিক ওদিকে পড়ে থাকত
অসংখ্য ক্রেস্ট, মেডেল, 'এ' ডিভিশন,
জেলা পর্যায়ের ম্যান অব দি ম্যাচ হবার বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন।
টেবিলের উপর পেপার কাটিং এর মেলার এ্যালবাম।
ন্যাশনাল টীমের ডাকের আশায় থাকতো সে।
ক্যাপ্টেনের লাল ব্যাচ পড়তে চেয়েছিল সে হাতে।
সত্যি বলতে, মাঝে মধ্যে বেশ ঈর্ষা হতো ওর জনপ্রিয়তাকে।
ওর প্রতি উঠতি বয়সী মেয়েদের আকৃষ্ট হওয়াকে খুব হিংসে করতাম।
পাশ কাটিয়ে যেতে পারিনি সেটাকে।
আমরা যখন চা-সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে রিং বানাবার
কায়দা রপ্ততে উঠেপড়ে লেগেছি,
মনোজ তখন লক্ষী ছেলেটির মতো চায়ের স্টলে
দুধের মিকচার খায় রোজ সকাল বিকেল।
তারপর একদিন এলো সেই দিনটি, রাজধানী শহরের
সাথে আমাদের জেলা স্টেডিয়ামে খেলা।
সাপোর্টারস গ্যালারিতে বসে গোল পাবার উন্মাদনায়
সমানে গলা ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছি আমরা ক'জনা।
ছুটছে মনোজ প্রাণপণে, পায়ে বল। হাতে মাত্র দেড়
মিনিট বাকি শেষ হুইসেলের। সামনে ফাইনালের হাতছানি।
ছুটছে মনোজ, ছুটছে উল্কা,
ছুটছে মেট্রো রাজ। ছুটছে ট্রাম,
ছুটছে সময়। ছুটছে মনোজ পাগলা ঘোড়া।
ছুটছে ডি-বক্স, ছুটছে বিশ গজ গোল পোস্টের,
ছুটছে মফস্বলের পতাকা, ছুটছে ন্যাশনাল টীম।
ন্যাশনাল টীমের ক্যাপ্টেন খোচিত লাল ব্যাচ।
হঠাৎ অপজিশনের কোচের ইশারা, চারজন ডিফেন্ডারের
মনোজের হাঁটু তাক করে ঝাঁপিয়ে পরা।
অস্ফুট গোঙরানো মনোজের, ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠা।
যখন মনোজ সম্বিতে ফিরলো, হাসপাতালের বেডে স্যালাইন চলছে।
উঠে বসতে চাইলো। পারলো না।
দূর্বল তো। আসলে দূর্বল ঠিক না,
একটা পা নেই ওর আজ।
সমস্ত রগগুলি ছিঁড়ে যাওয়ায় ভেতরের পঁচন ধরা রক্ষার্থে
অগত্যা কেটে ফেলতে হয়েছে থাই অবধি।
থেমে গেছে আজ মনোজ, মনোজের স্বপ্ন।
মনোজের ক্যাপ্টেন ব্যাচ। বল নিয়ে শত্রু এলাকার বক্ষ
ভেদ করে ঈগলের মতো ছোঁ মেরে গোল তুলে আনা।
থেমে গেছে বাঁ পায়ের রক্ত চলাচল।
ওদের স্বাধীনতাতেও হস্তক্ষেপ পড়েছে।
থেমেছে উঠতি কিশোরী, যুবতীদের মনোজ পাগলামি।
থেমেছে সেই ক্রেজ। একটা জীবন।
সময়ের তালে তালে আমরা এগিয়ে গিয়েছি।
অতীতে ডুবেছে ফুটবলের জাদুকর মনোজ।
মনোজের সেই বন্ধ জানালায় আর কোনদিন
কেউ টোকা দেয়নি। মনোজেরও আর কোনদিন মিকচার খাবার প্রয়োজন পড়েনি।
এখনো বৃষ্টি আসে মুষলধারে, এখনো ওরা বৃক্ষের পাতায় গড়িয়ে পড়ে।
মফস্বল শব্দটি আজও বেঁচে আছে।
শুধু ফুটবল এখন আমি দুচোখে দেখতে পারিনা।
একটা ফোভিয়া কাজ করে। মফস্বলের বৃষ্টির কথা মনে করিয়ে দেয়।
বৃষ্টি শব্দে জেগে থাকা রাতগুলির কথা মনে করিয়ে দেয়।
মনোজের অসহায়ত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়।
ওর কেটে ফেলা হাঁটুর কথা,
ছেঁড়া এঙ্কলেটগুলি হাতে নিয়ে
আকাশকে নাড়া দেওয়া ওর আর্তনাদের কথা
মনে করিয়ে দেয়।
একটা ঝুলে যাওয়া জীবনের কথা মনে করিয়ে দেয়।