Showing posts with label নতুন কবিদের কবিতা. Show all posts
Showing posts with label নতুন কবিদের কবিতা. Show all posts

Friday, March 13, 2020

নতুন কবিদের কবিতা

নতুন কবিদের কবিতা 

যদি আমার শরীরে পাখির ডানা থাকত
....অরণ্য আর্য

যদি আমার শরীরে পাখির ডানা থাকত এবং
আমি উড়ে গিয়ে পৌঁছে যেতাম তোমার কাছে,
আঁচলে ঢাকা বুকের খুব কাছাকাছি গিয়ে বলতাম
শুধু তোমার জন্য আকাশ পেরিয়ে এসেছি,
তখনও কি তুমি এমনি করে ফিরিয়ে নিতে মুখ?
শীত, বসন্ত কখনও কি আমি নেমে আসব না মাটিতে?
মেঘের মতন বায়বীয় বুকে আর কতকাল উড়ব একা!
জানি, চাক্ষুষ দেখাই সব নয়, নয় চূড়ান্ত কিছু;
তবু মাঝেমাঝে মনে হয়, হয়ত একটিবার সামনে গিয়ে
দাঁড়ালে তোমার চোখে আমি বরফের মত স্বচ্ছ
হয়ে যেতাম, চামড়া রক্ত মাংস ভেদ করে তুমি
হৃদয়ে সঞ্চিত সব বিক্ষিপ্ত বুদ্বুদ দেখে নিতে পারতে।
যদি পৃথিবীতে আজও অরণ্যের যুগ রয়ে যেত,
মানুষ ও হরিণের গতির পার্থক্য খুব বেশি হত না;
কোন প্রিয় হরিণীর সঙ্গে তুমি নদীর তীরের কাছে
সবুজ ঘাসের পরে শুয়ে শুয়ে যদি দেখতে কী করে
গোধূলির লাল আঁচে আকাশ দগ্ধ হয়ে ছাই হয়,
সেই আগুনকে সাক্ষী করে যদি আমি ঘাসফুল নিয়ে
চারপাশে ছড়িয়ে দিতাম, সেদিনও কি বিক্ষোভে
তুমি সব উড়িয়ে দিতে কপালের অবাধ্য চুলের মত?
পৃথিবীর সব দেওয়াল আবরণ ভেঙে গিয়ে যদি
শুধুই আকাশ থাকে, তোমার অবধি সব পর্দা সরে যায়,
আমার দীর্ঘশ্বাসে তোমার গাছের পাতা দুলে ওঠে,
নির্জন আঙিনায় জমে ওঠে মৃত পাতার পাহাড়,
তখনও কি তুমি দৃষ্টি দিতে না এ দিগন্তের দিকে?
পৃথিবীর ফিকে নীল আকাশ আরও রক্তিম হলে
ইচ্ছে ছিলো, শেষবার আহত হবার; তাই উন্মুক্ত
বুক নিয়ে উড়ে গেছি-- বিষাক্ত তীরের প্রতি যেমন
ছুটে যায় আত্মঘাতী চিল-- তাদের মিছিলে আমি
এক অনুসারী শুধু-- ধুধু মরুর পথে আলেয়া মুগ্ধ মুসাফির!
মুখে ছবির মতন হাসি নিয়ে স্তব্ধতায় থেকে গেলে;
তোমার চোখের দীপে ক্লান্তিহীন আলো জ্বলেছিল;
তবু আমি একটানা মৃদু এক আর্তনাদ শুনে
ডুবে গেছি নিবিড় অন্ধকারে, যেখানে সময় থেমে
আছে একটি প্রহরে তবু কেটে যায় অজস্র রাত!
তবুও তোমার হাতে আমার প্রদীপ জানি জ্বলবে না;
তোমার আঁধার বলবে না ব্যর্থ দীপের কোন কথা;
পৃথিবীর লাভার আকুলতা শান্ত হচ্ছে যতদিন ধরে
তারও আগে ঠিক হয়ে গেছে, তুমি কটাক্ষপাতে
আমার সকাল সন্ধ্যা আলোহীন করে নিভে যাবে;
সেই অভিশাপ তুমি কি ফিরিয়ে নেবে কোনদিন?
যদি আমি ডানা নিয়ে ছুটে যাই, 

বরফের মতন স্বচ্ছ গাছহয়ে
তোমার দরজার কাছে টপটপ করে ঝরাই সুরভি শিশির;
তুমি কি তখনও তোমার পায়ের কাছে তাকাবে না?

 আমি মাটিতে সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যাবার আগে
তোমার চোখের তাপে ফের বাষ্প হয়ে উড়ে যেতে চাই;
তুমি মৃত্যুর দিকেও কি চেয়ে দেখ না?

 দেখ না উড়ছে কত নশ্বর পাখি! 




ভালো থেকো তুমিও
(ইফফা তাবাসসুম তালুকদার জান্নাত)


হয়ত আমাদের আবার দেখা হবে
অচেনা কোনো রাস্তায় কিংবা চেনা কোনো গলিতে।
হয়ত আমরা দুইজনই দুইজনকে চিনতে পারবো
কিংবা না চিনার ভান করবো।
হয়ত দুইজনই দুইজনের দিকে 

তাকিয়ে পুরনো কথা মনে করে অল্প হাসবো।
কিংবা সবই ভুলে গেছি এমন একটা ভাব করবো।
হয়ত খুব করে জানতে ইচ্ছে হবে কেমন আছো?
কতো দিন পরে দেখা!
আচ্ছা! আমার কথা কি তোমার মনে পরে?
সেই বিকেল বেলা একসাথে পাশাপাশি কোচিং এ যাওয়ার কথা!
কলেজ যাওয়ার পথে ফুল হাতে নিয়ে পথ আটকানোর কথা!
সামান্য ঝগড়ায় ছেড়ে চলে যাবে বলে কেঁদে ভাসিয়ে দেওয়ার কথা!
কিংবা সামান্য অভিমানে গাল ফুলিয়ে মুখ ঘুরিয়ে বসে থাকার কথা!
ছোট ছোট খুনসুটি গুলোর কথা!
আচ্ছা!তোমার কি সেগুলো স্মৃতি মনে পরে?
নাকি হাজারো নতুনের ভিড়ে হারিয়ে ফেলেছো আমাকে চিরতরে!
এভাবেই দুইজনেই মনে মনে অনেক কথা বলবো।
যে কথা গুলো এতো দিন মনের মধ্যে চেপে রাখা ছিলো।
যে প্রশ্ন গুলো এতো দিন হৃদয় মাঝে দাগ কেটে যেতো।
আজও সেই প্রশ্ন গুলো দাগ কেটে গেলো দুইজনের হৃদয়ে।
দুইজনেই ভাববো আজ আর এগুলো জিজ্ঞাসা করে কি লাভ?
ও নিশ্চয় নতুনকে নিয়ে ভালোই আছে।
তারপরে দুইজনই পাশ কাটিয়ে চলে যাবো যে যার গন্তব্য স্থানে।
ভালো থাকুক স্মৃতিগুলো।
হাজারো নতুনের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া 

সেই পুরনো স্মৃতি গুলো সত্যিই ভালো থাকুক।
ভালো থেকো তুমিও।




 বোবা মেয়েটা 
....অন্ত মিলন


আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম,
বোবা মেয়েটা আমার সামনে এসে আমার হাতে 

এক পোটলা ঝালমুড়ি ধরিয়ে দিয়ে দিলো দৌড়।
আমি তার দিকে পলকহীন তাকিয়ে ছিলাম,
মুহুর্তের মধ্যেই হাওয়া হয়ে গেলো বোবা মেয়েটা।

বোবা মেয়েটা,
ঝালমুড়ি,
তার সৌন্দর্য, তার সৌন্দর্য বোধ, 

ঝাল মুড়িতে লাল গোলাপের পাপড়ি;
একটা কল্পনার ভেতরে কোথায় যেন হারিয়ে যাই আমি।
তার কেঁপে ওঠা ঠোঁট, তার কিছু বলতে না পারার আকুতি, 

তার গালের টোলে বসে থাকা পঙ্গপালের মতো দুঃখ গুলো;
আচমকা ঝাঁকি তোলে আমার বুকের ঠিক বাম পার্শে।

রোজ সকালে বকুল ফুল কুড়াতে যায় বোবা মেয়েটা।
আমি ঘর থেকে বের হয়ে গেলে,
বোবা মেয়েটা আমার ঘরের বারান্দায়
বকুল ফুলের মালা রেখে যায় প্রতিদিন।
আমি প্রতিদিন তার যত্ন করে রেখে যাওয়া
বকুল ফুলের মালা সযতনে আগলে রাখি আমার ঘরের দেয়ালে।
আমার সঙ্গে বোবা মেয়েটার দেখা হয়ে গেলে কখনও,
আমি তাকে কি যেন বলতে চাই,
আমি বলতে পারি না।
বোবা মেয়েটা লাজুক ভঙ্গিতে দৌড়ে পালায়,
আমি তাকে কিছুই বলতে পারি না।

কোনো কোনো দিন বিকেল বেলা বোবা মেয়েটা 
আনমনা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে পুকুরপাড়ে
গাব গাছটার নিচে।
আমি ধীর পায়ে এগিয়ে যাই তার কাছে,
তার পেছনে গিয়ে দাঁড়াই,
সে টের পায়না;
সে কিছুতেই টের পায়না আমার উপস্থিতি।
আমি পেছন থেকে তার চুলের তীব্র গন্ধ ভোগ করতে থাকি,
আমি মাতাল হতে থাকি তার চুলের তীব্র গন্ধে।
আমি তাকে মনে মনে আবৃত্তি করতে থাকি।
আমি আবৃত্তি করি তার চুল,
আমি আবৃত্তি করি তার চুলের তীব্র গন্ধ।
একটা মোহ আমার ভেতরে তখন কানামাছি খেলে,
খেলে গোল্লাছুট।
আমি আমার চোখ জোড়া বন্ধ করে,
আমি কোথায় যেন হারিয়ে যাই !

সেদিনও ভোর এসেছিল আমাদের নাগরিক জীবনে।
মুয়াজ্জিনের আযানের ধ্বনি কি আমার কানে এসেছিল সেদিন ?
সেদিনও কি উলুধ্বনি দিয়েছিল কেউ মন্দিরে মন্দিরে ?
একটা কাকের ডাকে আমার ঘুম ভেঙেছিল সেদিন।
আমি কফির পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে
পত্রিকার পাতায় দেখছিলাম -
ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের আপাদমস্তক।
অকস্মাৎ, আমার কর্ণকুহরে ভুমিকম্পের মতো 

ঢুকে গেলো একটি আর্তচিৎকার, "
 বোবা মাইয়াডা আর নাই, বো-বা-মা-ই-য়া-ডা! "
মহুয়া গাছটার চারিদিকে উৎসুক মানুষের ভীড় !
আমি নিথর দাঁড়িয়ে আছি !
আমি তাকিয়ে আছি মহুয়া গাছের ডালে ঝুলে থাকা একটা চাঁদের দিকে,
আমি একটা রক্তাক্ত পায়জামার দিকে তাকিয়ে আছি ;
আমি তাকিয়ে আছি একটা ছেঁড়া জামা'র দিকে,
আমি দেখতে পাচ্ছি -
আমার চোখের সামনে দিয়ে দৌড়ে পালাচ্ছে দশ হাজার উট,
দশ হাজার উটের বেঁচে থাকার আকুতি আমাকে আহত করছে খুব !
আমার চোখ অন্ধকার হয়ে আসছে,
আমি দেখতে পাচ্ছি -
অগণিত অন্ধকার হাত আমার দিকে তেড়ে আসছে,
আমি দশ হাজার উটের মতো দৌড়াতে পারছি না;
আমি দৌড়াতে পারছি না !

সেদিনও ভোর এসেছিল আমাদের নাগরিক জীবনে।





 আমি একটা পাগল
 ....অন্ত মিলন


আমি একটা পাগল, আস্ত পাগল, এবং পাগল, আর শুধুই পাগল !
আমি তোমার সিঁথির উপর দিয়ে হেঁটে যা-ই
তোমার মেরুদন্ডের বাঁকা পথে।
আমি তোমার পিঠের ভাঁজে ভাঁজে লিপিবদ্ধ করি
আমার ভাগ্য।
আমি তোমার সামনে দাঁড়াতে পারি না,
আমি তোমার চোখের দিকে তাকাতে পারি না !
আমি তোমার চোখের দিকে তাকালেই -
তোমার চোখের অগ্নি আমায় ভস্ম করে দেয়,
আমায় ধ্বংস করে দেয় ;
আমি কিছুতেই তোমার সামনে দাঁড়াতে পারি না।

আমি একদিন সাহস করে তোমার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
আমি একদিন সাহস করে তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
তোমার চোখের অগ্নি আমায় ভস্ম করে দিয়েছে,
আমায় ধ্বংস করে দিয়েছে।
তোমার চুল গুচ্ছ আমায় অক্টোপাসের মতো
টেনে নিয়েছে তোমার সিঁথিতে,
সে-ই থেকে আমার শুরু !

আমি তোমার সিঁথির উপর দিয়ে হেঁটে যা-ই
তোমার মেরুদন্ডের বাঁকা পথে !
আমি তোমার পিঠের ভাঁজে ভাঁজে লিপিবদ্ধ করি
আমার ভাগ্য।
আমি তোমার পিঠের চূড়ায় বসে নক্ষত্র দেখি,
নক্ষত্র গুনি, নক্ষত্র আবৃত্তি করি প্রতিদিন।
আমি একটা পাগল,
আস্ত পাগল,
এবং পাগল,
আর শুধুই পাগল !




কবিতা: বুমেরাং

তৃষা সাহা
০৯/০৩/২০৩০

সময়টা ঠিক বলতে পারবনা বাবু;
যখন ঘুম ভাঙল তখনো আলো ফোটেনি
ঠিক করে— মাঠে যাচ্ছিলাম কাজ সারতে,
তখন দেখি কি যেন একটা পড়ে আছে
রাস্তার ধারে; টর্চ মেরে দেখি
পাশের বাড়ীর সুজন মন্ডল পড়ে আছে!
বাবা গো! রক্তে একেবারে মাখামাখি!
ছুটে ঘরে এসে মানুষটারে জাগাই;
তা সে’ই ছুটাছুটি করে সবাইকে খবর দেয়!

আমার নাম? মালতী গো বাবু, মালতী মন্ডল!
সোয়ামীর নাম তারক মন্ডল।
আমি আপিস বাবুদের বাড়ী ঠিকে কাজ করি।
আমার মানুষটা ঐ সুজন কর্তার জমিতেই মুনিষ।
সুজন কর্তা লোক মন্দ ছিল না গো!
গরীবের জন্য তার মনে অনেক দয়া।
কুড়ি-পঁচিশ বিধে দুই ফসলি ধানের জমি তার;
তার বৌটাও নক্ষীমন্তর মেয়েমানুষ!
চিরটা কাল উপকার করেছে,
পূজা-পার্বণে মিষ্টিটা, ফলটা
আমার ছেলেপিলে গুলোকে দিত;
গেল মাসে আমার কোলেরটার জন্য
কলকাতা থেকে জামা এনে দিল,
মনটা বড় ভালো গো বাবু!

যবে থেকে সাহেব বাবুরা
কারখানা করার জমি খুঁজতে এল-
সব কেমন যেন পালটে গেল।
সুজন কর্তা চাষীদের বোঝাত—
কারখানা হলে নাকি কারো ভালো হবে না
রাতবিরেতে একা একা হেঁটে ফিরত
সক্কলে মানা করেছে— তা সেকথা শোনে কে?
যেন ভূতের ভর হয়েছিল;
সারাক্ষণ জমি আর জমি......জমি বাঁচাও লড়াই!

থানায় ওসির কাছে বয়ান দিয়ে বাড়ী ফিরলাম।
একটু পরে বিশু এসে বাকী টাকা দিয়ে যাবে;
অনেক টাকা...আদ্দেক টাকা আগেই দিয়েছে।
টাকাটা পেলেই মানুষটা খাসীর মাংস আনতে যাবে,
বাচ্চা গুলো কতকাল খায় নি!

বাসন গুলো মাজতে শুরু করলাম;
গতকাল সুজন কর্তার বাড়ী থেকে পায়েস পাঠিয়েছিল।
আমাদের দয়া দেখাতে এসেছিলেন! দয়া!
যত সব পয়সার ফুটানি। হুঃ!
দিয়েছি একেবারে বিষ দাঁত ভেঙে।
সুজন মন্ডলের যাবতীয় খবর
আমার কথাতেই তো মানুষটা বিশু কে দিয়েছিল,
নাহলে অন্য গ্রামের বিশুর তো জানার কথা না।

একটা প্রচন্ড শব্দে চমকে উঠলাম।
ঘর থেকে এল মনে হচ্ছে।
দৌড়ে দরজার সামনে গিয়ে দেখি-
মানুষটা পড়ে রক্তে ভেসে যাচ্ছে।
আরে! সামনের দরজা দিয়ে ওটা কে পালাল,
বিশু না?
চোখের সামনে সব কিছু যেন কুয়াশায় মিলিয়ে গেল-
আমি পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলাম।



তোমার অভাব
...অন্ত মিলন

তুমি নেই,
শুধু ঘাসফুল গুলো রয়ে গেছে
মগজের বারান্দায়।
পানকৌড়ির ঠোঁটে ঠোঁট রেখে ঝিমোয় অন্ধ তমসা,
ডাহুকের চিৎকারে জেগে ওঠে কালো আত্মা,
কালো আত্মার বিলাপে মায়া হরিণীর দীর্ঘশ্বাস।

তুমি নেই,
শুধু সন্ধা মালতী গুলো রয়ে গেছে
মগজের বারান্দায়।
রাজহংসীর পালকে লিপিবদ্ধ হয় হতাশার গান,
কাকের কর্কশ কণ্ঠে আবৃত্তি হয় রবীন্দ্রনাথ- নজরুল,
শিশিরের পায়ে চুম্বন করে বিষধর সাপ,
সাপদের মিছিলে শামিল হয় সময়ের হাত।

তুমি নেই,
শুধু গোলাপের পাপড়ি গুলো রয়ে গেছে
মগজের বারান্দায়।
গোলাপি হাঁস গুলো বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
সবুজ ময়ুর, মেটেমাথা টিয়া, খয়রা ঝিল্লি,
কিছুই আজ আর নেই, বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
ছাতিমের ডালে বসে টুনটুনির তৃপ্ত সঙ্গম,
আজ বিলুপ্ত প্রায়।
ছোট্ট প্রিয়াঙ্গু, জংলী বরই, তিত্তিরাজ,
সব হারিয়ে গেছে বাঁদর লাঠির মতো।

তুমি নেই,
শুধু কৃষ্ণচূড়া গুলো রয়ে গেছে
মগজের বারান্দায়।
ঘুঘুদের সম্মুখে ওঁৎ পেতে আছে বিলাসবহুল ফাঁদ,
কাকাতুয়ার বুক থেকে চুঁইয়ে পড়ছে যন্ত্রণা,
সাদা বক পাখি গুলো উড়ে যাচ্ছে মহাশূন্যে,
আর কোনোদিন ফিরবে না বাঁশ বাগানে।
সারস পাখি গুলো লুটোপুটি খাচ্ছে পথে-প্রান্তরে,
চড়ুই পাখি গুলো আর বাসা বাঁধে না বকুলের ডালে।

তুমি নেই,
শুধু রক্তকরবী গুলো রয়ে গেছে
মগজের বারান্দায়।
শহরের কলকারখানা গুলো বন্ধ হয়ে গেছে,
অফিস-আদালত গুলো আজ হুমকির মুখে,
রেস্তোরাঁ, মদি দোকান গুলো জনমানবহীন,
কাঁচাবাজারে আগুন ;
শ্রমিকেরা নেমেছে রাজপথে,
আন্দোলনের নামে চলছে গনহত্যা,
দুর্ভিক্ষ হামাগুড়ি দিচ্ছে ঘরের উঠোনে।

তুমি নেই,
শুধু গন্ধরাজ গুলো রয়ে গেছে
মগজের বারান্দায়।
কিছু হতাশা,
কিছু শূন্যতা,
কিছু বেদনা বোধ,
পেটুকের মতো গিলে ফেলেছে পৃথিবীর সুখ।
তুমি নেই,
শুধু কিছু স্বপ্ন রয়ে গেছে
মগজের বারান্দায়।



নেতা’ আপনাকেই বলছি
——————————


কাব্যগ্রন্থ- সময় ভেসে যায় বৃষ্টির জলে
কবি-রশিদ হারুন
২১/০৯/২০১৮


প্রিয় নেতা,
আমার বিপ্লবী অভিবাদন নিবেন।
আপনাকে আমি এখন প্রায়ই টেলিভিশন আর পত্রিকায় দেখি।
আপনার স্বাস্হ্য আগের চেয়ে ভালো হয়েছে।
মুখের কালো দাগগুলো বোধ হয় এখন নাই।
আপনাকে যেহেতু আর রোঁদে পুড়তে হয়না,
তাই আপনি দেখতে আরো সুন্দর হয়েছেন।

আপনার সাথে দেখা করার জন্য অনেক চেষ্টা করছি।
আপনার সরকারী বাসায় গিয়েছিলাম।
পুলিশ ঢুকতে দিলোনা।
ফোন করেছিলাম অনেকবার,
আপনার পুরোনো নাম্বারে।
আপনার ব্যাক্তিগত সহকারী প্রতিবারই ফোন ধরে বলে-
“ আপনি পরে ফোন করুন, স্যার এখন মিটিং এ”।

আমি প্রতিবারই বলি-
“আমার নামটা বলবেন,
আমাকে যেন উনি এই নাম্বারে একটা ফোন দেন।
আমার খুব জরুরী দরকার।”

আপনার ফোন আর কখনোই আসলো না।
আপনাকে বোধহয় আমার নামটা

 বলেনি আপনার ব্যাক্তিগত সহকারী!!
বললে ,আপনি আমাকে নিশ্চয়ই ফোন করতেন।

আমি খুবই সমস্যায় পড়েছি।
‘বিপ্লব’ শব্দ’টি আমি প্রথমে আপনার মুখ থেকে শুনি।
তখন আমি কলেজে ১ম বর্ষে।
আপনি আমাদের ছাত্র সংসদের নেতা ছিলেন।
সবার নায়ক ছিলেন শুধু আপনার প্রতিবাদী কথার জন্য।
খুব সুন্দর ভাবে কথা বলতে পারতেন আপনি।
শুধু শুনতেই ইচ্ছে করতো।
আপনার চলাফেরা, কথাবার্তা, 

সবই ছিলো আমাদের আদর্শ।
আপনার আপোষহীন চরিত্র আমাকে

 নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে।
আপনি আমাকে যে ‘বিপ্লব’ শিখিয়েছিলেন-
সেখানে ছিলো শুধু সমাজ পরিবর্তনের কথা।
সম অধিকারের কথা,
ধর্মনিরপক্ষ রাষ্ট্রর কথা,
ক্ষধার্ত মানুষের জন্য খাবারের গল্প,
‘মানুষ’ এর জন্য মানুষের ত্যাগের কথা।
আহা শুধু শুনতেই ইচ্ছে করতো।
নিজেকে তখন মনে হতো চরম ‘বিপ্লবী’।

আপনার হয়তো মন নেই-
আমি আমার অসুস্হ বিধবা ‘মা’এর চিকিৎসার টাকা 

আপনার ‘বিপ্লবী ফান্ডে’ দিয়েছিলাম।
আপনি তখন আমাকে দেখিয়ে সবাইকে বলেছিলেন,
“ ওর দিকে তাকাও,
ও আজ আমাদের জন্য উদাহরণ হয়ে থাকলো।
দেশ হলো আসল মা।
একজন ‘মা’ মরে গেলে কিছু হবে না,
কিন্ত্তু দেশ মরে গেলে সবার ‘মা’ মরে যাবে”।
তখন আমার গর্বে বুক ফুলে উঠেছিলো।

আমার ‘মা’ বিনা চিকিৎসায় ঠিকই মরে গিয়েছিলো।
কারোই কিছু হয়নি,
শুধু কষ্ট পেয়ে চিৎকার কেঁদেছিলো 

আমার ছোট ভাই-বোন গুলো।
ওরাতো আর ‘বিপ্লব’ বুঝতো না।
আমারও কেমন যেনো কান্না পেয়েছিলো।
তবুও কাঁদিনি, যদি কেউ দেখে ফেলে,
আমি যে তখন চরম বিপ্লবী।

এই বিপ্লব বুকে নিয়ে সারাদিন আপনার সাথেই ছিলাম,
আপনার দেখানো রাস্তায় চলতে গিয়ে,
পুলিশ কেইস আর জেল জুলুমে লেখা পড়াটাও

 শেষ করতে পারলাম না।
জেলে বসেই শুনেছি আপনি সরকারী দলে যোগ দিয়েছেন,
আপনি এখন সরকারের বড় মন্ত্রী।

অনেক’দিন পর জেল থেকে বেড়িয়ে দেখি
একজন ও অভ্যর্থনা জানতে জেল গেটে নেই।
কেউ চিনলো না আমাকে।
শুধু দরিদ্র ভাই-বোন গুলো বুকে জড়িয়ে ধরেছিলো।

আপনাকে আমার জরুরী দরকার শুধু
একটি কথা জানার জন্য-
আপনি আমাকে যে বলেছিলেন,
“একজন ‘মা’ মরে গেলে কিছু হবে না,
কিন্ত্তু দেশ মরে গেলে সবার ‘মা’ মরে যাবে”।
আমার যে এখন সারাদিন মা’র কথাই মনে পড়ে।
যে’দিন পত্রিকায় আপনার মা’য়ের সাথে

 সুন্দর হাসিখুসি একটা ছবি দেখলাম-
সে’দিন আমার মা’র কথা বেশি মনে পড়লো।
আচ্ছা বলুনতো,-
‘বিপ্লব’ কথার অর্থ কি বদলে গেছে
আমি যখন জেলে ছিলাম?”
আমার খুব সন্দেহ হয় আমি বিপ্লবী হতে পারিনি।
আপনি যে ভাবে বলেছিলেন।

নেতা,
আমার না সারাদিন শুধু মা’র কথাই মনে পড়ে।
“বিপ্লব দীর্ঘজীবি হোক”
——————————————



---একটু ছুঁয়ে থেকো ---
রাশেদুল ইসলাম


এই শোন?
তুমি শুধু একটু পাশে থেকো,
আলতো করে ছুঁয়ে হাতটা শুধু ধরে রেখো।

যেমন করে ছুঁয়ে যায় পাখির ডাক ভোর ,
আর ঘুম ভেঙে রমনী ছোঁয় ঘরের ডোর !
যেমন করে ছুঁয়ে যায় সূর্যের হাসি,
সকালের নরম রোদ!
যেমন করে নদী ছুঁয়ে যায় প্রবল স্রোত।
যেমন করে রাখাল ছুঁয়ে যায় বাঁশি।

~~~~কি গো ওমন ছুঁয়ে
পাশে থাকবে তো?

এই শোন?
আমার পাশে থাকবে গো,
বাগানে যেমন ফুল ছুঁয়ে থাকে,
নৌকা যেমন নদীর কূল ছুঁয়ে থাকে!
বৃক্ষ যেমন ছুঁয়ে থাকে পাতা লতা শাখা ,
চিল, শকুনি, ঈগল যেমন ছুঁয়ে থাকে পাখা।

ওমন করে করে ছুঁয়ে পাশে থাকবে।
ঘাস যেমন ছুঁয়ে থাকে মাটি ,
বুড়ো বুড়ি যেমন ছুঁয়ে থাকে লাঠি !
সাগর যেমন ছুঁয়ে থাকে চর ,
প্রকৃতি যেমন ছুঁয়ে থাকে ঝর !

ওমন করে ছুঁয়ে ছুঁয়ে ,
থাকবে পাশে হাতটি শুধু ধরে।

~~~~কি গো পারবে না কি তুমি?
ঝিনুক যেমন ছুঁয়ে থাকে মুক্ত "
কথা এবং ছন্দ যেমন ছুঁয়ে থাকে লুপ্ত!
কাশ ফুল যেমন ছুঁয়ে থাকে বন "
প্রেমিকা যেমন ছুঁয়ে থাকে মন!
মাছ যেমন ছুঁয়ে থাকে জল ,
কাঠ বেড়ালী যেমন ছুঁয়ে থাকে ফল !

ওমন করে ছুঁয়ে ছুঁয়ে ,
শুধু থাকবে হাতটা আমার ধরে।

বসন্ত যেমন ছুঁয়ে থাকে কোকিল পাখি "
অশ্রু যেমন ছুঁয়ে থাকে আঁখি !
রাস্তা যেমন ছুঁয়ে থাকে গাড়ী ,
টিনের চাল যেমন করে ছুঁয়ে থাকে বাড়ি !

ওমন করে ছুঁয়ে ছুঁয়ে ,
শুধুই হাতটা রেখো ধরে।

~~~~কি গো পারবে তো?
মাঝি যেমন করে ছুঁয়ে থাকে পাল ,
জেলে যেমন করে ছুঁয়ে থাকে জাল !
বৃষ্টি যেমন করে ছুঁয়ে থাকে আকাশ ,
বৃক্ষ বন যেমন করে ছুঁয়ে থাকে বাতাস !

ওমন করে ছুঁয়ে ছুঁয়ে ,
শুধু হাতটা রাখবে গো ধরে।

ঝর্ণা যেমন ছুঁয়ে থাকে পাহাড়,
ক্ষুদা যেমন করে ছুঁয়ে থাকে আহার !

ওমন করে কিন্তু ছুঁয়ে থাকতেই হবে?
সূর্য যেমন শেষ বিদায়ে ছুঁয়ে যায় সন্ধ্যা ,
প্রেমিক যেমন কমল হাতে ছুঁয়ে থাকে রজনী গন্ধা !
যেমন করে ছুঁয়ে থাকে জোনাকি রাত,
ঠিক তেমন করে হাতে ছুঁয়ে রেখো হাত!

আঁধারে যেমন ওঠে জোছনা,
আমাকে ছুঁয়ে করে রেখো ওসনা!

ওমন করে ছুঁয়ে ছুঁয়ে ,
শুধু হাতটা রাখবে ধরে!

আমি জানি এই হাত তুমি ছাড়বে না,
এই হাত ছাড়া একা থাকতে তুমিও গো পারবে না!

যেমন করে ধান ছুঁয়ে থাকে জমি,
এবার তেমন করে ঠিক বলেছো তুমি!

ছাড়বো না গো ছাড়বো না,
একা থাকতে যে আমিও পারবো না!

শক্ত করে ধরবো,
ঐ হাতে হাত রেখে দুজন এক সাথে মরবো ।





তুমি বরং জিড়িয়ে নাও 
/ অন্ত মিলন

আমার ভাঙা কপালের উপর দিয়ে তুমি 
কোথায় হেঁটে যাচ্ছো নারী?
এই পথ তোমায় তীর্থ চেনাবে না কোনোদিন।
এই পথে বিপদ অনিবার্য !
এই বিপদসীমার উপর দিয়ে তুমি কোথায় হেঁটে যাচ্ছো নারী ?
বরং তুমি আমার বুকের উপর দিয়ে হেঁটে যাও,
তুমি আমার কাশ ফুলের উপর দিয়ে হেঁটে যাও,
তুমি আমার কবিতার উপর দিয়ে হেঁটে যাও !
আমার বুকের কাশফুল আর আমার 

বুকের কবিতাগুলো তোমায় তীর্থ চেনাবে।
হেঁটে হেঁটে তুমি বড়ো ক্লান্ত, অবসন্ন !
তোমার একটুখানি বিশ্রাম খুব বেশি দরকার।
তুমি বরং আমার ডান চোখের ভেতরে গহীন গুহায়
কিছুসময় জিড়িয়ে নাও !
ভয় নেই, ভূতপ্রেত তোমায় তাড়া করবে না।

 ভয়ংকর কোনো গোখরো, কিংবা সিংহের কোনো হুংকার নেই 
আমার চোখের ভেতরে গহীন গুহায়।
তোমার ভয় নেই নারী,
তুমি কিছুসময় জিড়িয়ে নাও !

তোমার পায়ে কাঁটা ফুটে রক্ত বেরোচ্ছে !
তুমি বরং আমার ঠোঁটে রাখো তোমার পা যুগল,
আমার ঠোঁট ব্লটিং পেপারের মতো
শুষে নেবে তোমার পায়ের ক্ষত।
তুমি বরং আমার ঠোঁটে রাখো তোমার পা যুগল !

এই রাতবেরাতে আমার পোড়া কপালের 
উপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে তুমি কোথায় যাচ্ছো নারী ?
এই পথ তোমায় গন্তব্য চেনাবে না কোনোদিন।
এই পথে ধ্বংস অনিবার্য !
এই আঁধার পথে হেঁটে তুমি কোথায় যাচ্ছো নারী ?
বরং তুমি আমার বুকের উপর দিয়ে হেঁটে যাও,
তুমি আমার দূর্বাঘাসের উপর দিয়ে হেঁটে যাও,
তুমি আমার অণুগল্পের উপর দিয়ে হেঁটে যাও !
আমার বুকের দূর্বাঘাস আর আমার বুকের অণুগল্প গুলো
তোমায় তোমার গন্তব্য চেনাবে।

হেঁটে হেঁটে তুমি বড়ো ক্লান্ত, অবসন্ন !
তুমি বরং আমার ডান চোখের ভেতরে গহীন গুহায়
কিছু সময় জিড়িয়ে নাও !




























Friday, February 14, 2020

রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ



বাতাসে লাশের গন্ধ
- রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই
আজো আমি মাটিতে মৃত্যূর নগ্ননৃত্য দেখি,
ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরে…
এ দেশ কি ভুলে গেছে সেই দু:স্বপ্নের রাত, সেই রক্তাক্ত সময় ?
বাতাসে লাশের গন্ধ ভাসে
মাটিতে লেগে আছে রক্তের দাগ।
এই রক্তমাখা মটির ললাট ছুঁয়ে একদিন যারা বুক বেঁধেছিলো।
জীর্ণ জীবনের পুঁজে তারা খুঁজে নেয় নিষিদ্ধ আধাঁর,
আজ তারা আলোহীন খাঁচা ভালোবেসে জেগে থাকে রাত্রির গুহায়।
এ যেন নষ্ট জন্মের লজ্জায় আরষ্ট কুমারী জননী,
স্বাধীনতা – একি হবে নষ্ট জন্ম ?
একি তবে পিতাহীন জননীর লজ্জার ফসল ?

জাতির পতাকা খামচে ধরেছে আজ পুরোনো শকুন।
বাতাশে লাশের গন্ধ
নিয়ন আলোয় তবু নর্তকীর দেহে দুলে মাংসের তুফান।
মাটিতে রক্তের দাগ -
চালের গুদামে তবু জমা হয় অনাহারী মানুষের হাড়
এ চোখে ঘুম আসেনা। সারারাত আমার ঘুম আসেনা-
তন্দ্রার ভেতরে আমি শুনি ধর্ষিতার করুণ চিৎকার,
নদীতে পানার মতো ভেসে থাকা মানুষের পচা লাশ
মুন্ডহীন বালিকার কুকুরে খাওয়া বিভৎস্য শরীর
ভেসে ওঠে চোখের ভেতরে। আমি ঘুমুতে পারিনা, আমি
ঘুমুতে পারিনা…
রক্তের কাফনে মোড়া – কুকুরে খেয়েছে যারে, শকুনে খেয়েছে যারে
সে আমার ভাই, সে আমার মা, সে আমার প্রিয়তম পিতা।
স্বাধীনতা, সে আমার – স্বজন, হারিয়ে পাওয়া একমাত্র স্বজন -
স্বাধীনতা – আমার প্রিয় মানুষের রক্তে কেনা অমূল্য ফসল।
ধর্ষিতা বোনের শাড়ী ওই আমার রক্তাক্ত জাতির পতাকা।




হে আমার বিষণ্ন সুন্দর – 

রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

সারারাত স্বপ্ন দেখি, সারাদিন স্বপ্ন দেখি
যে-রকম আকাশ পৃথিবী দ্যাখে, পৃথিবী আকাশ,
একবার অন্ধকারে, একবার আলোর ছায়ায়
একবার কুয়াশা-কাতর চোখে, একবার গোধুলির ক্লান্ত রোদে-
সারারাত স্বপ্ন দেখি-সারাদিন স্বপ্ন দেখি।
একখানি সুদূরের মুখ জ্ব’লে থাকে চেতনার নীলে,
কে যেন বাদক সেই স্বপ্নের ভেতরে তোলে বিষাদের ধ্বনি
আঁকে সেই প্রিয়মুখে-সুদূরের মুখে
বর্ণময় রঙিন বিষাদ।
ফিরে আয় বোলে ডাকি- সে বাদক উদাসিন থামে না তবুও…
সারারাত স্বপ্ন দেখি, সারাদিন স্বপ্ন দেখি-
স্বপ্নের ভেতরে তুমি হে আমার বিষণ্ন সুন্দর
চোখের সমুখে আজ কেন এসে দাঁড়ালে নিঠুর!
কেন ওই রক্তে-মাংসে, কেন ওই নশ্বর ত্বকের আবরণে
এসে আজ শুধোলে কুশল?
হে আমার বিষণ্ন সুন্দর
হৃদয়ের কূল ভেঙে কেন আজ এতো জল ছড়ালো শরীরে
কেন আজ বাতাসে বসন্ত দিন ফিরে এলো কুয়াশার শীতে!
কে  সেই বংশীবাদক স্বপ্নের শিয়রে বসে বাজাতেন বাঁশি
বেদনার ধ্বনি তুলে রাত্রি দিন, সে আজ হারালো কোথায়?
বেদনার রঙ দিয়ে আমি যারে আঁকি
হৃদয়ের রক্ত দিয়ে আমি যারে আঁকি
আমার কষ্ট দিয়ে, আমার স্বপ্ন দিয়ে যে আমার নিভৃত নির্মাণ
সেই তুমি- হে আমার বিষণ্ন সুন্দর
মর্মমূল ছিঁড়ে এসে ঠাঁই নিলে কেন এই মাংসের বুকে!
কেন ওই বৃক্ষতলে, কেন ওই নদীর নিকটে এসে বোলে গেলে
তোমার ঠিকানা!
আমি তো প্রার্থনাগুলো শস্যের বীজের মতো দিয়েছি ছড়িয়ে
জল তাকে পুষ্টি দেবে, মাটি তাকে ভূমি দেবে, তুমি তার গভীর ফসল-
বাতাসে তুলোর মতো তুমি তবে উড়ে এলে কেন!
কেন আজ পোড়া তুষের গন্ধে শুধু জন্মের কথা মনে পড়ে!
শৈশব কৈশোর এসে মিশে থাকে ফাল্গুনের তুমুল হাওয়ায়
একটি রাত্রি কেন হয়ে ওঠে এতো দীর্ঘ দীর্ঘ রাত?
হে আমার বিষণ্ন সুন্দর
দু’চোখে ভাঙন নিয়ে কেন এই রুক্ষ দুঃসময়ে এলে
কেন সমস্ত আরতির শেষে আজ এলে শূন্য দুখানি হাত!
কেন এলে, বিষণ্ন সুন্দর, তুমি কেন এলে?





উল্টো ঘুড়ি –

 রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

এতো সহজেই ভালোবেসে ফেলি কেন!
বুঝি না আমার রক্তে কি আছে নেশা-
দেবদারু-চুলে উদাসী বাতাস মেখে
স্বপ্নের চোখে অনিদ্রা লিখি আমি,
কোন বেদনার
বেনোজলে ভাসি সারাটি স্নিগ্ধ রাত?
সহজেই আমি ভালোবেসে ফেলি,
সহজে ভুলিনা কিছু-
না-বলা কথায় তন্ত্রে তনুতে পুড়ি,
যেন লাল ঘুড়ি একটু বাতাস পেয়ে
উড়াই নিজেকে আকাশের পাশাপাশি।
সহজে যদিও ভালোবেসে ফেলি
সহজে থাকি না কাছে,
পাছে বাঁধা পড়ে যাই।
বিস্মিত তুমি যতোবার টানো বন্ধন-
সুতো ধ’রে,
আমি শুধু যাই দূরে।
আমি দূরে যাই-
স্বপ্নের চোখে তুমি মেখে নাও ব্যথা-
চন্দন চুয়া,
সারাটি রাত্রি ভাসো উদাসীন
বেদনার বেনোজলে…
এতো সহজেই ভালোবেসে ফ্যালো কেন?






কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প – 
রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ
...................................


তাঁর চোখ বাঁধা হলো।
বুটের প্রথম লাথি রক্তাক্ত
করলো তার মুখ।

থ্যাতলানো ঠোঁটজোড়া লালা
রক্তে একাকার হলো,
জিভ নাড়তেই দুটো ভাঙা দাঁত
ঝরে পড়লো কংক্রিটে।
মা…..মাগো….. চেঁচিয়ে উঠলো সে।
পাঁচশো পঞ্চান্ন মার্কা আধ-
খাওয়া একটা সিগারেট
প্রথমে স্পর্শ করলো তার বুক।
পোড়া মাংসের উৎকট গন্ধ
ছড়িয়ে পড়লো ঘরের বাতাসে।
জ্বলন্ত সিগারেটের স্পর্শ
তার দেহে টসটসে আঙুরের
মতো ফোস্কা তুলতে লাগলো।
দ্বিতীয় লাথিতে ধনুকের
মতো বাঁকা হয়ে গেলো দেহ,
এবার সে চিৎকার করতে পারলো না।
তাকে চিৎ করা হলো।
পেটের ওপর উঠে এলো দু’জোড়া বুট,
কালো ও কর্কশ।
কারণ সে তার পাকস্থলির কষ্টের
কথা বলেছিলো ,
বলেছিলো অনাহার ও ক্ষুধার কথা।
সে তার দেহের বস্ত্রহীনতার
কথা বলেছিলো –
বুঝি সে-কারণে ফর ফর
করে টেনে ছিঁড়ে নেয়া হলো তার
সার্ট।
প্যান্ট খোলা হলো। সে এখন
বিবস্ত্র , বীভৎস।
তার দুটো হাত-মুষ্টিবদ্ধ যে-হাত
মিছিলে পতাকার
মতো উড়েছে সক্রোধে,
যে-হাতে সে পোস্টার সেঁটেছে,
বিলিয়েছে লিফলেট,
লোহার হাতুড়ি দিয়ে সেই হাত
ভাঙা হলো।
সেই জীবন্ত হাত , জীবন্ত মানুষের
হাত।
তার দশটি আঙুল-
যে-আঙুলে ছুঁয়েছে সে মার মুখ,
ভায়ের শরীর,
প্রেয়সীর চিবুকের তিল।
যে -আঙুলে ছুঁয়েছে সে সাম্যমন্ত্রে দীক্ষিত
সাথীর হাত ,
স্বপ্নবান হাতিয়ার,
বাটখারা দিয়ে সে-আঙুল পেষা হলো।
সেই জীবন্ত আঙুল, মানুষের
জীবন্ত উপমা।
লোহার সাঁড়াশি দিয়ে,
একটি একটি করে উপড়ে নেয়া হলো তার
নির্দোষ নখগুলো।
কী চমৎকার লাল রক্তের রঙ।
সে এখন মৃত।
তার শরীর ঘিরে
থোকা থোকা কৃষ্ণচূড়ার মতো
ছড়িয়ে রয়েছে রক্ত ,
তাজা লাল রক্ত।
তার থ্যাতলানো একখানা হাত
পড়ে আছে এদেশের মানচিত্রের ওপর,
আর সে হাত থেকে ঝরে পড়ছে রক্তের
দুর্বিনীত লাভা ….
 
 


অভিমানের খেয়া - 
রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ
 
 
‘এতোদিন কিছু একা থেকে শুধু খেলেছি একাই
পরাজিত প্রেম তনুর তিমিরে হেনেছে আঘাত
পারিজাতহীন কঠিন পাথরে
প্রাপ্য পাইনি করাল দুপুরে,
নির্মম ক্লেদে মাথা রেখে রাত কেটেছে প্রহর
বেলা_
এই খেলা আর কতোকাল আর কতোটা জীবন!
কিছুটা তো চাই- হোক ভুল হোক মিথ্যে প্রবোধ,
অভিলাষী মন চন্দ্রে না পাক, জ্যোৎস্নায় পাক
সামান্য ঠাঁই
কিছুটা তো চাই, কিছুটা তো চাই।
আরো কিছুদিন, আরো কিছুদিন– আর কতোদিন?
ভাষাহীন তরু বিশ্বাসী ছায়া কতোটা বিলাবে?
কতো আর এই রক্ততিলকে তপ্ত প্রণাম!
জীবনের কাছে জন্ম কি তবে প্রতারণাময়?
এতো ক্ষয়, এতো ভুল জমে ওঠে বুকের বুননে,
এই আঁখি জানে, পাখিরাও জানে, কতোটা ক্ষরণ
কতোটা দ্বিধায় সন্ত্রাসে ফুল ফোটে না শাখায়
তুমি জানো নাই– আমি তো জানি
কতোটা গ্লানিতে এতো কথা নিয়ে, এতো গান,
এতো হাসি নিয়ে বুকে
নিশ্চুপ হয়ে থাকি
বেদনার পায়ে চুমু খেয়ে বলি এই তো জীবন,
এইতো মাধুরী, এই তো অধর ছুঁয়েছে সুখের সুতনু
সুনীল রাত।
তুমি জানো নাই– আমি তো জানি
মাটি খুঁড়ে কারা শষ্য তুলেছে,
মাংসের ঘরে আগুন পুষেছে
যারা কোনোদিন আকাশ চায়নি নীলিমা চেয়েছে
শুধু,
করতলে তারা ধরে আছে আজ বিশ্বাসী হাতিয়ার
পরাজয় এসে কণ্ঠ ছুঁয়েছে লেলিহান শিখা,
চিতার চাবুক মর্মে হেনেছো মোহন ঘাতক
তবুও তো পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে মুখর হৃদয়,
পুষ্পের প্রতি প্রসারিত এই তীব্র শোভন বাহু।
বৈশাখী মেঘ ঢেকেছে আকাশ
পালকের পাখি নীড়ে ফিরে যায়–
ভাষাহীন এই নির্বাক চোখ চোখ আর কতোদিন?
নীল অভিমানে পুড়ে একা আর কতোটা জীবন?
কতোটা জীবন?’
‘কিছুটা তো চাই– হোক ভুল হোক মিথ্যে প্রবোধ,
অভিলাষী মন চন্দ্রে না পাক, জ্যোৎস্নায় পাক
সামান্য ঠাঁই
কিছুটা তো চাই, কিছুটা তো চাই… ‘
====== =.=.= =======


ফুলের কৃষ্ণপক্ষ - 
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
 
আমি যার হাতে ফুল তুলে দেই
সে - ই প্রথম ভুল বোঝে আমাকে ।
আমি যাকে বিশ্বাসযোগ্য ভেবে
মনে মনে এক নির্জন স্বপ্নকে স্বাস্থ্যবান
কোরে তুলি ,
আমার বিশ্বাস নিয়ে সুবর্ণ চোর
শুধু সেই পালিয়ে যায় ।
আমি যাকে ফুল দিই সে - ই ভুল বোঝে ,
চিরদিন এরকম বিপরীত হয় ।
আমি যার শিয়রে রোদ্দুর এনে দেব বোলে
কথা দিয়েছিলাম
সে আঁধার ভালবেসে রাত্রি হয়েছে ।
এখন তার কৃষ্ণপক্ষে ইচ্ছের মেঘ
জোনাকির আলোতে স্নান করে ,
অথচ আমি তাকে তাজা রোদ্দুর দিতে
চেয়েছিলাম।
বয়সে মাথা রেখে জেগে আছে একজন
তাকে তো দিইনি কিছুই -
অথবা যে ফুলের মৌলিক অর্থ কখনো শেখেনি
ভালবেসে রাত্রি জাগরণ ,
চোখের নিচে অনিদ্রার শোকচিহ্ন রাখেনি
সাজিয়ে
আমি যার হাতে ফুল তুলে দিই
সে - ই প্রথম ভুল উঝে আমাকে ।
আমি ভুল বুঝলে কে আমার
হাতে তুলে দেবে ফুলের স্বপ্ন ?
====== =.=.= =======


অনিদ্রার শোকচিহ্ন -
 রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
 
বুকের ভেতরে এই ঝড় তুমি জানবে না,
নিরুপায় ধ্বংসের মাঝে কেন এই
স্বেচ্ছাদহনে অনায়াসে স্বপ্নের সরল
সংসারখানা ভেঙ্গে ফেলি !
তুমি জানবে না
একখণ্ড মেঘের জন্যে কি বিশাল মরুভুমি
অভ্যন্তরে
তুমুল সাইমুমে বিশটি চৈত্রের নিচে
পুড়ে যায় অক্ষম ক্ষোভে !
এই চোখ দেখে তুমি বুঝবে না ,
কতোটা ভাঙনের চিহ্ন
জীবনের কতটা পরাজয় ছুঁয়ে তার বেড়েছে
বয়সের মেধা ।
অভিমানে কণ্ঠ বুজে আসে , নিরপরাধ বাসনার
চোখে স্বচ্ছ কাঁচের মতো জমে থাকে জল ,
টলমল-
তবু ঝরেনা কখনো ...
শরীরে ঘামের ঘ্রাণে শুধু কেটে যায় বেলা ,
ক্লান্তিগুলো খুলে খুলে আগামীকে বলিঃ
জননীর
অপেক্ষা নিয়ে কতোটুকু রেখেছ আমার
পৌষে নবান্নের মতো কতোটুকু সুস্থির
নিশ্চয়তা?
পরাজয় ক্ষত বুকে উবু হয়ে পড়ে থাকা রাতের
শরীরে গ্লানির ক্ষরণে এসে যায় চাঁদের করুন
অবয়ব
তবু তুমি কিছুই জানো না -
এশিয়ার রাত জানে কতোটুকু অনিদ্রার শোক
জীবনের
দুই চোখে বেড়ে ওঠে ভয়ানক কঠিন আক্রোশে !
====== =.=.= =======
 
 
 
‘‘মাধবীর অবিশ্বাস্য স্মৃতি’’ - 
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
 
মাধবী কাল চ'লে যাবে।
ওর হাতে ফুলগুলো তুলে দিয়ে বললাম
'তুমিও কি ফুল হয়ে ঝ'রে যাবে?'
ও নির্বাক উদাসীন।
ওর কাকের পাখার মতো কালো চোখ
মুহূর্তে জলে ভ'রে এলো
মৃদু কাঁপলো পাপড়িগুলো।
সদ্য কেনা জ্যামিতি বকসের
চকচকে পিঠের মতো
ওর চোখ জ্বলজ্বল কোরে উঠলো
লাল পেড়ে শাড়ির মতো ওর ঠোঁট
ও কথা বলতো গানের মতো
যেন অনুরোধের আসরের
চিরপরিচিত কোনো কন্ঠস্বর।
ওর ঠোঁট কাঁপলো
থির থির
থির থির
ছায়াছবির ভেলভেট স্ক্রীনের মতো।
ও আমাকে জড়িয়ে ধরলো
শিশুর মতো কাঁদলো ও।
ওর লাল ঠোঁট বার বার কাঁপলো
ও বললো 'আমি তোকে ভুলবো না কোনদিন।'
অথচ এই মাধবীই বলতো
প্রায়ই বলতো
স্মৃতি বোলে কোনো কিছুই আমি
বিশ্বাস করি না।
====== =.=.= =======


খতিয়ান –
রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ
 
‘হাত বাড়ালেই মুঠো ভরে যায় ঋণে
অথচ আমার শস্যের মাঠ ভরা।
রোদ্দুর খুঁজে পাই না কখনো দিনে,
আলোতে ভাসায় রাতের বসুন্ধরা।
টোকা দিলে ঝরে পচা আঙুলের ঘাম,
ধস্ত তখন মগজের মাস্তুল
নাবিকেরা ভোলে নিজেদের ডাক নাম
চোখ জুড়ে ফোটে রক্তজবার ফুল।
ডেকে ওঠো যদি স্মৃতিভেজা ম্লান স্বরে,
উড়াও নীরবে নিভৃত রুমালখানা
পাখিরা ফিরবে পথ চিনে চিনে ঘরে
আমারি কেবল থাকবে না পথ জানা–
টোকা দিলে ঝরে পড়বে পুরনো ধুলো
চোখের কোণায় জমা একফোঁটা জল।
কার্পাস ফেটে বাতাসে ভাসবে তুলো
থাকবে না শুধু নিবেদিত তরুতল
জাগবে না বনভূমির সিথানে চাঁদ
বালির শরীরে সফেদ ফেনার ছোঁয়া
পড়বে না মনে অমীমাংসিত ফাঁদ
অবিকল রবে রয়েছে যেমন শোয়া
হাত বাড়ালেই মুঠো ভরে যায় প্রেমে
অথচ আমার ব্যাপক বিরহভূমি
ছুটে যেতে চাই– পথ যায় পায়ে থেমে
ঢেকে দাও চোখ আঙুলের নখে তুমি।’
**********************************


মানুষের মানচিত্র ১ –
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
 
আহারে বৃষ্টির রা, সোহাগি লো, আমি থাকি দূর
পরবাসে।
কান্দে না তোমার বুকে একঝাঁক বুনোপাখি অবুঝ
কৈতর?
কেমনে ফুরায় নিশি? বলো সই, কেমনে- বা কাটাও
প্রহর?
পরাণ ছাপায়ে নামে বাউরি বাতাস, দারুণ বৃষ্টির মাসে।
যে বলে সে বলে কথা, কাছে বসে, হাতে খিলিপান দিয়ে
কয়-
এতো জল ঝরে তবু পরান ভেজে না কেন, কও তো
মরদ?
দুয়ারে লাগায়ে খিল যদি কেউ থাকে তারে কে দেবে
দরদ।
শরীরের মোহনায় দেখি তার বুনো ঢেউ রক্ত-মাংসময়।
শরীর গুটায়ে রাখি, শামুকের মতো যাই গুটায়ে ভেতরে।
অন্ধকার চিরে চিরে বিজুলির ধলা দাঁত উপহাসে হাসে,
আমি বলি- ক্ষমা দাও, পরান বন্ধুয়া মোর থাকে
পরবাসে,
দেহের রেকাবি খুলে পরানের খিলিপান কে খাওয়াবে
তোরে।
গতবার আষাঢ়ও পার হয়ে গেলো তাও নামে না বাদল,
এবার জ্যোষ্ঠিতে মাঠে নেমে গেছে কিষানের লাঙল-
জোয়াল।
আমাদের মাঝে দেখো জমির ভাগের মতো কতো শত
আল্,
এই দূর পরবাস কবে যাবে? জমিনের আসল আদল।
কবে পাবো? কবে পাবো আল্ হীন একখণ্ড মানব-
জমিন?
পরবাস থাকবে না, থাকবে না দূরত্বের এই রীতি-নীতি।
মহুয়ার মদ খেয়ে মত্ত হয়ে থাকা সেই পার্বনের তিথি
কবে পাবো? কবে পাবো শর্তহীন আবাদের নির্বিরোধ
দিন?
**********************************


বাবাকে লেখা রুদ্রের চিঠি
 
আব্বা, পথে কোনো অসুবিধা হয়নি। নাসরিনকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে গত পরশু ঢাকায় ফিরেছি। আপনাদের মতামত এবং কোনোরকম আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া আমি বিয়ে করে বৌ বাড়ি নিয়ে যাওয়াতে আপনারা কষ্ট পেয়েছেন। কিন্তু আমি তো আমার জীবন এভাবেই ভেবেছি।
আপনার সাথে আমার যে ভুল বোঝাবুঝিগুলো তা কখনই চ্যালেঞ্জ বা পিতা-পুত্রের দ্বন্দ্ব নয়, স্পষ্টতই তা দুটো বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব। ব্যক্তি আপনাকে আমি কখনোই ভুল বুঝিনি, আমি জানি না আমাকে আপনারা কিভাবে বোঝেন। এতো চরম সত্য যে, একটি জেনারেশনের সাথে পরবর্তী জেনারেশনের অমিল এবং দ্বন্দ্ব থাকবেই। যেমন আপনার সাথে আপনার আব্বার অমিল ছিলো, আপনার সাথে আমার এবং পরবর্তীতে আমার সাথে আমার সন্তানদের। এই দ্বন্দ্ব ও সংঘাত কোনোভাবেই রোধ করা সম্ভব নয়।
আমরা শুধু এই সংঘাতকে যুক্তিসঙ্গত করতে পারি; পারি কিছুটা মসৃন করতে। সংঘাত রোধ করতে পারিনা। পারলে ভালো হতো কিনা জানিনা। তবে মানুষের জীবনের বিকাশ থেমে যেতো পৃথিবীতে। আমার মনে পড়ে না।
এই ছাব্বিশ বছরে একদিনও পিতা হিসাবে আপনার সন্তানদের আদর করে কাছে টেনে নেননি। আশেপাশে অন্য বাবাদের তাদের সন্তানদের জন্য আদর দেখে নিজেকে ভাগ্যহীন মনে হয়েছে। কিন্তু এ নিয়ে কখনো কষ্ট প্রকাশ করিনি। ছেলেবেলায় আমার খেলতে ভালো লাগতো। খেললে আমি ভালো খেলোয়ার হতাম।
আপনি খেলতে দিতেন না। ভাবতাম, না খেললেই বোধ হয় ভালো। ভালো মানুষেরা বোধ হয় খেলে না। আবার প্রশ্ন জাগতো, তাহলে আমার খেলতে ভালো লাগে কেনো? আমি কি তবে খারাপ মানুষ? আজ বুঝি, খেলা না খেলার মধ্যে মানুষের ভালো-মন্দ নিহিত নয়। কষ্ট লাগে।
আমিও স্বপ্ন দেখতাম, আমি ডাক্তার হবো। আপনার চেয়ে বড় ডাক্তার হয়ে আপনাকে ও নিজেকে গৌরব দেবো। সন্তান বড় হলে পিতারই তো সুখ। আমি সেভাবে তৈরীও হচ্ছিলাম। কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধের পর কি যে এক বিরাট পরিবর্তন এলো ! একটি দেশ, একটি নতুন দেশের জন্ম হলো, নতুন চিন্তার সব হতে লাগলো।
নতুন স্বপ্ন এলো মানুষের মনে। সবাই অন্যরকম ভাবতে শুরু করলো। আমিও আমার আগের স্বপ্নকে ধরে রাখতে পারিনি। তারচেয়ে বড় এক স্বপ্ন, তারচেয়ে তাজা এক স্বপ্ন, তারচেয়ে বেগবান এক স্বপ্নকে আমি কাছে টেনে নিলাম। আমি সিরিয়াসলি লিখতে শুরু করলাম।
আগেও একটু আধটু লিখতাম, এবার পুরোপুরি। আমি আমার আগের সব চিন্তা-ভাবনার প্রভাব ঝেড়ে ফেলতে লাগলাম। চিন্তা থেকে, জীবন থেকে, বিশ্বাস-আদর্শ থেকে, অনেক কিছুর সঙ্গেই সংঘর্ষ হতে লাগলো। অনেক কিছুর সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝির শুরু হলো। কখনো ক্ষোভে আমি অপ্রত্যাশিত কিছু করে ফেলতে লাগলাম।
আপনার সাথে আমার সাথে বিশ্বাসের সাথে মিল এমন মানুষের দেখা পেলাম। তাদের সাথে সংঘাতও হলো। একি ! সবার সাথে সংঘর্ষ হয় কেন? মনে মনে আমি ভীষণ অস্থির হয়ে পড়লাম। তাহলে কি এপথ ভুল পথ? আমি কি ভুল পথে চলেছি? কখনো মনে হয়েছে, আমিই ঠিক, এই প্রকৃত পথ। মানুষ যদি নিজেকে ভালোবাসতে পারে তবে সবচেয়ে সুন্দর হবে।
নিজেকে ভালোবাসতে গেলে সে তার পরিবারকে ভালোবাসবে। আর পরিবারকে ভালোবাসা মানেই একটি গ্রামকে ভালোবাসা। একটি গোষ্ঠীর মানুষকে ভালোবাসবে। আর একটি গ্রাম মানেই তো সারা পৃথিবী। পৃথিবীর সব মানুষ - সব মানুষ সুন্দর হয়ে বাঁচবে।
পৃথিবীতে কত বড় বড় কাজ করেছে মানুষ। একটা ছো্‌ট্ট পরিবারকে সুন্দর করা যাবে না? অবশ্যই যাবে। একটু যৌক্তিক হলে, একটু খোলামেলা হলে কত সমস্যা এমনিতেই মিটে যাবে। সম্পর্ক সহজ হলে কাজ সহজ হয়। আমরা চাইলেই তা করতে পারি।
জানিনা এ চিঠিখানায় আপনি ভুল বুঝবেন কিনা। ঈদের আগে আগে বাড়ি আসবো। আম্মাকে বলবেন, যেন বড় মামার কাছ থেকে হাজার চারেক টাকা নিয়ে আমাকে পাঠায়। বাসায় রান্নার কিছুই কেনা হয়নি। বাইরের খাওয়ায় খরচ বেশী এবং অস্বাস্থ্যকর।
আম্মার তদারকিতে দেওয়া সম্পত্তির এটুকুই তো রিটার্ন মাত্র। আপনার সেন্টিমেন্টে লাগতে পারে। লাগাটাই স্বাভাবিক। কারণ আপনার শ্বশুড়বাড়ি। আমাদের কিসের সেন্টিমেন্ট? শিমু মংলায় পড়বে, বাবু স্কুলে।
আপনারা না চাইলেও এসব করা হবে। দোয়া করবেন। - শহিদুল্লাহ



দ্বিধাগ্রস্ত দাঁড়িয়ে আছি
— রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
 
সেই যে আমি দাঁড়িয়েছিলাম, মনে পড়ছে?
সেই যে আমি উসস্কো-খুস্কো আউল বাউল একমাথা চুল,
সেই যে আমি রক্তচুক্ষ, দুই চোখে দুই রক্তজবা
মনে পড়ছে?
সেই যে আমি দাঁড়িয়েছিলাম, তোমার স্মৃতিবন্ধের উপর
দাঁড়িয়েছিলাম, মনে পড়ছে? সকাল, তোমার মনে পড়ছে?
সেই যে আমি মিছিল জুড়ে মত্ত আওয়াজ
মারমুখো এক রক্ত যুবক, রক্তপাতের স্বপ্ন মাথায়
সেই যে আমি মিছিল-ক্লান্ত একলা মানুষ
সেই যে আমি স্বপ্নে ভীষন রক্ত দেখি, টকটকে লাল রক্ত দেখি
সেই যে আমি রাত্রে চোখে ঘুম আসে না
চোখ চুজলেই মিছিল দেখি, বুলেটবিদ্ধ মানুষ দেখি
সেই যে আমি একটুখানি স্নেহের কাঙাল, মনে পড়ছে?
সেই যে আমি দাঁড়িয়েছিলাম, দ্বিধাগ্রস্ত দাঁড়িয়েছিলাম
মনে পড়ছে? সকাল, তোমার মনে পড়ছে?
তখন আমার মুঠোয় তাজা আগ্নেয়াস্ত্র
সমতার এক মন্ত্র আমার বুকের ভেতর
কিন্তু আমি দাঁড়িয়ছিলাম, দ্বিধাগ্রস্ত দাঁড়িয়েছিলাম ।
কারন আমি পথ চিনি না, হত্যাযোগ্য লোক চিনি না,
কেন আমি ভুল মানুষের খুনে আামার হাত রাঙাবো!
মনে পড়ছে সেই যে আমি দাঁড়িয়েছিলাম
একটি ভাঙা ব্রীজের উপর দাঁড়িয়েছিলাম দ্বিধাগ্রস্ত...
সেই যে আমি একটি শাদা ফুলের খোঁজে বেরিয়েছিলাম
সেই যে আমি একটা নোতুন বাড়ির খোঁজে বেরিয়েছিলাম
সেই যে আমি
পরান- জোড়া ভালোবাসার স্বপ্ন নিয়ে বেরিয়েছিলাম
মনে পড়ছে, সকাল তোমার মনে পড়ছে?
আমার সহযাত্রীরা কেউ শিকারে খুব না করেছে
কেউবা অন্ধকারের থাতায় লিখেছে তার মূল ঠিকানা।
সেই যে আমি আলোর খোঁজে বেরিয়েছিলাম,
আমার চতুর্পাশ্বে আলো আমি ভীষন অন্ধকারে।
আামার চর্তুপাশ্বে আলো ভিন্ন আলো--
আলো জ্বলছে, অন্ধকারে ফুল ফুটছে। আলো জ্বলছে,
ব্যক্তিগত বাড়ি উঠছে। আলো জ্বলছে, ভিন্ন আলো।
কিন্তু আমি দাঁড়িয়েছিলাম, দ্বিধাগ্রস্ত দাঁড়িয়েছিলাম
দাঁড়িয়ে আছি।
আমার হাতে আগ্নেয়াস্ত্র-
হত্যাযোগ্য লোক চিনি না।
আমার বুকে অগ্নিমন্ত্র-
শিকারে এই হাত ওঠে না।
সেই যে ভাঙা ব্রীজের উপর দাঁড়িয়েছিলাম দ্বিধাগ্রস্ত
দাঁড়িয়ে আছি
দাঁড়িয়ে আছি...






হাড়েরও ঘরখানি
--রুদ্র মুহম্মাদ শহিদুল্লাহ
 
মানুষের প্রিয় প্রিয় মানুষের প্রানে
মানুষের হাড়ে রক্তে বানানো ঘর
এই ঘর আজো আগুনে পোড়ে না কেন?
ঘুনপোকা কাটে সে-ঘরের মূল-খুঁটি
আনাচে কানাচে পরগাছা ওঠে বেড়ে,
সদর মহলে ডাকাত পড়েছে ভর দুপুরের বেলা
প্রহরীরা কই? কোথায় পাহারাদার?
ছেনাল সময় উরুত দ্যাখায়ে নাচে
নপুংশকেরা খুশিতে আত্মহারা ।
বেশ্যাকে তবু বিশ্বাস করা চলে
রাজনীতিকের ধমনী শিরায় সুবিধাবাদের পাপ
বেশ্যাকে তবু বিশ্বাস করা চলে
বুদ্ধিজীবীর রক্তে স্নায়ুতে সচেতন অপরাধ
বেশ্যাকে তবু বিশ্বাস করা চলে
জাতির তরুন রক্তে পুষেছে নির্বীর্যের সাপ-
উদোম জীবন উল্টে রয়েছে মাঠে কাছিমের মতো।
২.
কোনো কথা নেই- কেউ বলে না, কোন কথা নেই- কেউ চলে না,
কোনো কথা নেই- কেউ টলে না, কোন কথা নেই- কেউ জ্বলে না-
কেউ বলে না, কেউ চলে না, কেউ টলে না, কেউ জ্বলে না।
যেন অন্ধ, চোখ বন্ধ, যেন খঞ্জ, হাত বান্ধা,
ভালবাসাহীন,বুক ঘৃনাহীন, ভয়াবহ ঋন
ঘাড়ে চাপানো-শুধু হাঁপানো, শুধু ফাঁপানো কথা কপচায়-
জলে হাতড়ায়, শোকে কাতরায় অতিমাত্রায় তবু জ্বলে না।
লোহু ঝরাবে, সব হারাবে- জাল ছিঁড়বে না ষড়যন্ত্রের?
বুক ফাটাবে, ক্ষত টাটাবে- জাল ছিঁড়বে না ষড়যন্ত্রের?
৩.
আমি টের পাই, মাঝ রাত্তিরে আমাকে জাগায় স্মৃতি-
নিরপরাধ শিশুটির মুখ আমাকে জাগায়ে রাখে
নিরপরাধ বধুটির চোখ আমাকে জাগায়ে রাখে
নিরপরাধ বৃদ্ধটি তার রেখাহীন করতর
আমাকে জাগায়ে রাখে।
মনে পড়ে বট? রাজপথ. পিচ? মনে পড়ে ইতিহাস?
যেন সাগরের উতলানো জল নেমেছে পিচের পথে
মানুষের ঢেউ আছড়ে দোহাই কূলে?
মনে কি পড়ে না, মনে কি পড়ে না, মনে কি পড়ে না কারো?
কি বিশাল সেই তাজা তরুনের মুষ্ঠিবদ্ধ হাত
যেন ছিঁড়ে নেবে গ্লোব থেকে তার নিজস্ব ভূমিটুকু!
মনে কি পড়ে না ঘন বটমূল, রমনার উদ্যান
একটি কন্ঠে বেজে উঠেছিলো জাতির কন্ঠস্বর?
শত বছরের কারাগার থেকে শত পরাধীন ভাষা
একটি প্রতীক কন্ঠে সেদিন বেজেছিলো স্বাধীনতা।
হাতিয়ারহীন, প্রস্তুতি নেই, এলো যুদ্ধের ডাক,
এলো মৃত্যুর, এলো ধ্বংশের রক্ত মাখানো চিঠি।
গ্রাম থেকে গ্রামে, মাঠ থেকে মাঠে গঞ্জের সুবাতাসে
সে-চিঠি ছড়ায় রক্ত-খবর, সে-চিঠি ঝরায় খুন,
স্বজনের হাড়ে করোটিতে জ্বলে সে-চিঠির সে আগুন।
৪.
ভরা হাট ভেঙে গেল।
মাই থেকে শিশু তুলে নিল মুখ সহসা সন্দিহান,
থেমে গেল দূরে রাখালের বাঁশি, পাখিরা থামালো গান,
শ্মশান নগরী, খাঁ-খাঁ রাজপথে কাকেরা ভুললো ডাক।
প'ড়ে রলো পাছে সাত পুরুষের শত স্মৃতিময় ভিটে,
প'ড়ে রলো ঘর, স্বজনের লাশ, উনুনে ভাতের হাঁড়ি,
ভেঙে প'ড়ে রলো জীবনের মানে জ্বলন্ত জনপদে-
নাড়ি-ছেঁড়া উন্মুল মানুষের সন্ত্রাসে কাঁপা স্রোত
জীবনের টানে পার হয়ে গেল মানচিত্রের সীমা।
৫.
মনে কি পড়ে না, মনে কি পড়ে না, মনে কি পড়ে না তবু?
গেরামের সেই শান্ত ছেলেটি কী রোষে পড়েছে ফেটে
বন্ধুর লাশ কাঁধে নিয়ে ফেরা সেই বিভীষিকা রাত
সেই ধর্ষিতা বোনের দেহটি শকুনে খেয়েছে ছিড়ে-
মনে কি পড়ে না হাতে গ্রেনেডের লুকোনো বিস্ফোরণ?
তারও চেয়ে বেশি বিস্ফোরণের জ্বালা জ্বলন্ত বুকে
গর্জে উঠেছে শত গ্রেনেডের শত শব্দের মতো।
গেরামের পর গেরাম উজাড় উঠোনে উঠেছে ঘাস।
হাইত্ নের’ পরে ম’রে পড়ে আছে পালিত বিড়াল ছানা,
কেউ নেই, শুধু তেমাথায় একা ব্যথিত কুকুর কাঁদে।
আর রাত্রির কালো মাটি খুঁড়ে আলোর গেরিলা আসে-
৬.
ঝোপে জঙ্গলে আসে দঙ্গলে আসে গেরিলার
দল, হাতিয়ার হাতে চমকায়। হাত ঝলসায়
রোষ প্রতিশোধ। শোধ রক্তের নেবে তখতের
নেবে অধিকার। নামে ঝনঝায়-- যদি জান যায়
যাক, ক্ষতি নেই; ওঠে গর্জন, করে অর্জন মহা ক্ষমতার,
দিন আসবেই, দিন আসবেই, দিন সমতার।
৭.
দিন তো এলো না !
পৃথিবীর মানচিত্র থেকে ছিঁড়ে নেয়া সেই ভূমি
দূর্ভিক্ষের খরায় সেখানে মন্বন্তর এলো ।
হত্যায় আর সন্ত্রাসে আর দুঃশাসনের ঝড়ে
উবে গেল সাধ বেওয়ারিশ লাশে শাদা কাফনের ভিড়ে,
তীরের তরীকে ডুবালো নাবিক অচেতন ইচ্ছায়।
৮.
আবার নামলো ঢল মানুষের
আবার ডাকলো বান মানুষের
আবার উঠলো ঝড় মানুষের
৯.
গ্রাম থেকে উঠে এলো ক্ষেতের মানুষ
খরায় চামড়া- পোড়া মাটির নাহান,
গতরে ক্ষুধার চিন্ মলিন বেবাক,
শিকড় শুদ্ধ গ্রাম উঠে এলো পথে।
অভাবের ঝড়ে-ভাঙা মানুষের গাছ
আছড়ে পড়লো এসে পিচের শহরে ।
সোনার যৌবন ছিলো নওল শরীরে
নওল ভাতার ঘরে হাউসের ঘর,
আহারে নিঠুর বিধি কেড়ে নিলো সব-
সোনার শরীরে বেচে সোনার দোসর ।
দারুন উজানি মাঝি বাঘের পাঞ্জা
চওড়া সিনায় যেন ঠ্যাকাবে তুফান।
আঁধার গতর জেলে, দরিয়ার পুত
বুকের মধ্যে শোনে গাঙের উথাল ।
তাদের অচেনা লাশ চিনলো না কেউ
ঝাঁক ঝাঁক মাছি শুধু জানালো খবর।
বেওয়ারিশ কাকে বলো, কার পরিচয় ?
বাংলার আকাশ চেনে, চেনে ওই জল
আমার সাকিন জানে নিশুতির তারা,
চরের পাখিরা জানে পাড় ভাঙা নদী
আমি এই খুনমাখা মাটির ওয়ারিশ ।
১০.
স্বপ্ন হারানো মানুষের ঢল রাজপথে আসে নেমে
স্বজন হারানো মানুষের ঢল রাজপথে আসে নেমে
ক্ষুধায় কাতর মানুষের ঢল রাজপথে আসে নেমে
পোড়ায় নগরী, ভাঙে ইমারত, মুখোসের মুখ ছেঁড়ে
ছিঁড়ে নিতে চায় পরাধীন আলো প্রচন্ড আক্রোশে।
১১.
আমি কি চেয়েছি এতো রক্তের দামে
এতো কষ্টের, এত মৃত্যুর, এতো জখমের দামে
বিভ্রান্তির অপচয়ে ভরা এই ভাঙা ঘরখানি?
আমি কি চেয়েছি কুমির তাড়ায়ে বাঘের কবলে যেতে?
আর কতো চাস? আর কতো দেবো কতো রক্তের বলী?
প্রতিটি ইঞ্চি মাটিতে কি তোর লাগেনি লোহুর তাপ?
এখনো কি তোর পরান ভেজেনি নোনা রক্তের জলে?
ঝড়ে বন্যায় অনাহারে আর ক্ষুধা মন্বন্তরে
পুষ্টিহীনতা, জুলুমে জখমে দিয়েছি তো কোটি প্রান-
তবুও আসেনা মমতার দিন, সমতা আসেনা আজো।
১২.
হাজার সিরাজ মরে
হাজার মুজিব মরে
হাজার তাহের মরে
বেঁচে থাকে চাটুকর, পা-চাটা কুকুর
বেঁচে থাকে ঘুনপোকা, বেঁচে থাকে সাপ।
১৩.
খুনের দোহাই লাগে, দোহাই ধানের
দোহাই মেঘের আর বৃষ্টির জলের
দোহাই, গর্ভবতী নারীর দোহাই
এ-মাটিতে মৃত্যুর অপচয় থামা
আসুক সরল আলো, আসুক জীবন
চারিদিকে শত ফুল ফুটুক এবার।
১৪.
জাতির রক্তে ফের অনাবিল মমতা আসুক
জাতির রক্তে ফের সুকঠোর সসতা আসুক
আসুক জাতির প্রানে সমতার সঠিক বাসনা ।
















প্রেমের কবিতা

আমাকে ভালোবাসার পর – হুমায়ুন আজাদ আমাকে ভালবাসার পর আর কিছুই আগের মত থাকবে না তোমার, যেমন হিরোশিমার পর আর কিছুই আগের মতো ন...